Flash Fiction, Love, Philosophy, Respect for the renowned Bengali writer Mr.Sunil Gangopadhyay

গত ২৩ শে অক্টোবর সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু দিবস উপলক্ষে

কালো আকাশটার গা ঘেঁষে সূর্যটা উঠতে শুরু করল। তারা গুলো চুপি-চুপি জোনাকির ছদ্মবেশ ধরল আর চুপটি করে লুকিয়ে পড়ল গুহার মধ্যে। লম্বা-লম্বা দেবদারু গাছগুলোর মাথা ঝাকড়া পাতা গুলোর ফাঁক দিয়ে সূর্যের সেই ‘প্রথম আলো’-টা ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীময়। পাখিদের ডাকের মাঝে শুধু ‘ঝর্ণার জলে’-র আওয়াজের তীব্রতাটাই একটু হারিয়ে গেল। জীবনের তেত্রিশটা বছর কাটিয়েছি এই ভেবে ভেবে যে, ‘কেউ কথা রাখেনি’। নাদের আলি কথা দিয়েছিল আমি বড়ো হলে সে আমাকে ‘তিন প্রহরের বিল’ দেখাবে। নাদের আলি! কোথায় সে! সে তো হাওয়ার সাথে মিলিয়ে গিয়েছে! আজ ‘নীরা’ অবশেষে তুমি এলে আমার সাথে, দুজনে একসাথে ‘তিন প্রহরের বিল’ দেখব বলে। সেই মধ্য রাত থেকে জেগে থাকার ছোট-বড়ো ক্লান্তি গুলো আজ তোমায় ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। কিরকম করে ঘুমোচ্ছ দেখ! ঠিক ছোট্ট শিশুটার মতো। যে দেবদারু গাছে ভর দিয়ে তুমি ঘুমোচ্ছ, তার পাতার ফাঁক দিয়ে একদল সোনালি রোদ তোমার শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তোমার মুখ, ঠোঁট, গাল, এলো চুল সবকিছু ধুয়ে দিচ্ছে সোনালি আলোটা। আর আমি, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু চেয়ে আছি তোমার দিকে। মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছে সোনালি আলো না, ‘সোনালি দুঃখ’ গড়িয়ে পড়ছে তোমার গাল, ঠোঁট আর চিবুক গড়িয়ে। ‘অর্ধেক জীবন’ এই সোনালি দুঃখকেই পরম সুখ মনে করে মখমলের চাদরের মতো জড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম নিজের সর্বাঙ্গে। ছুঁটে ফিরেছি বারবার, দুঃখ নামের নীল বিষটাকে গলায় ধারণ করতে শিখিয়েছিলেন মহেশ্বর। তাইতো নিজের  পৃথিবী খুঁজে ১০৮ টা নীল পদ্ম জড়ো করলে যে নীল রঙ খুঁজে পাওয়া যায় তার তুলনায় আমার কণ্ঠের গরলের নীল রঙ ছিল গাঢ়। তুমি দেখতে পাওনি নীরা.. কেবল চিঠির মধ্যে খুঁজতে চেয়েছ ভুল করে লেখা ভুল গুলো। ‘মহারাজ, আমি তোমার…’ নাহঃ সেই পুরনো বালক ভৃত্যটা আর নই। গত ছয়বছর আগেই ইস্তফা দিয়েছি তোমার কাজে। মহারাজ নীরাকে আজ যেতে দাও। ঘুমোতে দাও দেবদারু কোলে মাথা রেখে। ছয়টা বছর অপেক্ষায় ছিলাম এই তোমার এলাকায়। আজ নীরা আমার সাথে যাবে। ঘুম ভাঙলে, ঘুমোলে ওকে কেমন লাগে আজ সে সচক্ষে দেখবে।

তারপর…

‘ মহারাজ, কাঁদে না ছিঃ !’

Advertisements
Flash Fiction, Uncategorized

লগ্নভ্রষ্টা

মৃতফুলের মালা দিয়ে সাজিয়েছিলাম প্রাঙ্গণ, বাসরঘর… আজও সাজিয়ে চলেছি। তবু তুমি আসবে না। চেয়ে থাকবে তোমার অন্যপৃথিবীর জানলা দিয়ে। মৃত রজনীগন্ধার মালা থেকে আজকে ঐ সুগন্ধ আর ভেসে আসে না সেই দিনের পর থেকে, যেদিন ঐ তেলচিটে প্রদীপটার থেকে ভেসে এসেছিল টাটকা তেলের গন্ধ। সলতেতে ধরেছিল আগুন। সেই আগুনের মতোই লাবণ্যপ্রভা হয়েছিলাম আমি, একটা কুড়িয়ে পাওয়া আলগা অহংকার আমায় চেপে ধরেছিল। শঙ্খ-উলুধ্বনিতে রব সৃষ্টি হয়েছিল এই প্রাঙ্গণে। আর ঠিক তারপরেই আমার নামের সাথে আরেকটা তকমা এঁটে গিয়েছিল, ‘লগ্নভ্রষ্টা’। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জা, ঘেন্না, রাগ, আমার অযাচিত অহংকারীনি হওয়ার সুখটা কেড়ে নিলো এক লহমায়.. লাবণ্যপ্রভা মুখখানির রক্তিমতা মিশে গেল বেনারসির লাল বর্ণের সঙ্গে। তখন প্রদীপ থেকে কেবলই ধোঁয়া বের হচ্ছে। আগুন নিভে গিয়েছে। জ্বলেনি আর কখনই।

এখন, সপ্তর্ষিমন্ডলের শেষ দাগটা জুড়তে-জুড়তে তোমায় এইকথা গুলো চিঠিতে লিখছি। তোমায় না পাঠানো চিঠি গুলোতে মরচে ধরার মতো লাল ছোপ পড়েছে। কম দিন তো হলো না, এই পঁয়ত্রিশ বছরের রোজকার এই একই অভ্যাস। তারার সঙ্গে তারাদের জুড়তে-জুড়তে, সপ্তর্ষি মন্ডল খুঁজতে-খুঁজতে, তোমায় পাঠাবো না বলে, একটা করে চিঠি লেখা।

আরণ্যক, তোমার নাতি। আজ সে এই বাড়ির আঙ্গিনায় এসেছে। বর বেশে। আমার বাড়ির এক মেয়েকে তার স্ত্রী করে নিয়ে যাবে বলে। আজ সেই একই ছাদের নীচেই জ্বলন্ত সলতে ডুবানো টাটকা তেলের গন্ধ, ক্ষণে-ক্ষণে মুখোরিত হচ্ছে বাড়ি, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে। সত্তর দশকের এই লগ্নভ্রষ্টার আজ সেখানে যেতে মানা। আগে চাইতাম আরও হাজার-হাজার তুমি আর হাজার-হাজার আমি-র মাঝখানে বেঁচে থাক এই কাঁটাতারের বেড়া, স্বার্থক হোক তোমার ব্রাহ্মণত্বের গরিমা। কিন্তু আজ তা আর চাই না, কারণ, পুরুষেরা কখনও লগ্নভ্রষ্ট হয় না। তারা ধূসরক্ষেত্রে যুদ্ধ করে এলেও সমাজ তাদের অমলিন দেখে। তবু আশা রাখি ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। কেবলই কনকাঞ্জলির আবেগে ধুয়ে যাবে পুরোনো মুহুর্ত গুলো, গড়ে উঠবে নতুন ইতিহাস।