Flash Fiction, Uncategorized

আমতুল্লাহের মহালয়া

amar durga 5 expআজ নাকি মহালয়া! ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় মেয়েটার সবচেয়ে প্রিয় গানটা কানে যেতেই চট করে বিছানায় উঠে বসলো সে। ক্ষণিকের জন্য নিজের উপর খুব রাগ হয়ে গেল তার। সারা রাত জেগেছে সে মহালয়া শুনবে বলে, আর তা শুরু হওয়ার সময়-ই তাকে ঘুমিয়ে পড়তে হল! যা হোক! গানটা কানে যেতেই শরীরের সমস্ত অসন্তোষ যেন অদ্ভুত ভালোলাগা আর তৃপ্তির মধ্যে হারিয়ে গেল। গুচ্ছ-গুচ্ছ সুরেলা-সংস্কৃত শ্লোক ভেসে আসছে পাড়ার ক্লাব থেকে। বিগত চার বছর ধরে প্রধানত তার অনুরোধেই পাড়ার ক্লাবটা লউড-স্পিকারে মহালয়া চালায়। পুজোর ব্যাপার তাই অতো ভোরে স্পিকার বাজলেও কেউ কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। এছাড়া মহালয়া শোনার উপায়-ই বা কি মেয়েটার। চার বছর আগেই যে আজানের সুরে, মহালয়ার সুর চাপা পড়ে গিয়েছে। এই মহালয়া আসলেই তার দিস্তা-দিস্তা ধূসর ইতিহাস যেন রঙ বিস্তার করে রঙিন হয়ে ওঠে চোখের সামনে। মনে পড়ে সেই চার বছর আগেকার কথা। সে নাকি চার বছর আগে কলকাতাবাসী ছিল। দুর্গা পূজার সময় বাড়ির ঠাকুরদালানেই মূর্তি তৈরি করা হতো। না না হয় এখনও হয়। আর মহালয়ার দিন ভোর চারটের সময় ঠাকুরদালানে বসে মহালয়া শোনা হয়, সঙ্গে থাকে মায়ের চক্ষুদান পর্ব। আজ সেই কলকাতাতে থাকা মেয়েটা আর আজকের ঢাকাতে বসবাসকারী কারোর স্ত্রী হয়ে যাওয়া মেয়েটার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। বিধর্ম কাউকে বিয়ে হওয়ার কারণে কলকাতা ছাড়াতে হয় তাকে, সঙ্গে-সঙ্গে ধর্মটাকেও ঐ ঠাকুরদালানে গচ্ছিত রেখে আসতে হয়েছিলো তাকে। সে এখন সম্পূর্ণ মুসলমান একটি পরিবারের মানুষ। ঐ দিনগুলোর পর থেকে এবং ঢাকাবাসী হয়ে যাওয়ার সময় থেকে তার মহালয়ার দিন ঘুম ভাঙলেও সে আর কোনও দিন-ই তৎপর হয়নি মায়ের চক্ষুদান নিয়ে। হঠাৎ, মণ্ডপ থেকে একটা ডাক ছিটকে এলো, ‘আমতুল্লাহ আসবে? মায়ের চক্ষুদান হচ্ছে আসবে?’ মেয়েটির চারটে বছরের জন্য চক্ষুদানের বিষয়ে উদাসীন হয়ে পড়লেও মেয়েটি আরেকবার তৎপর হল সে বিষয়ে।এখন মেয়েটির নাম ‘আমতুল্লাহ’।এই নামটা বলেই সকলে সম্বোধন করে তাকে। যে নামটার অর্থ, আল্লাহ্‌র সেবিকা কিন্তু আজ সে ছুটে গেল মহামায়ার সেবায় উপস্থিত হতে। সূর্যালোক যেমন কখনও কোনও নির্দিষ্ট স্থানে আপতিত হতে ভেদাভেদ করে না, ঠিক তেমনই মহামায়া কিংবা আল্লাহ্‌-রাও পৃথিবীর কোনও মানুষের মধ্যেই ধর্মের কাঁটাতার বিছিয়ে দেননা। মণ্ডপের দিকে ছুটে গেল আমতুল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে স্পিকার থেকে ভেসে এলো, ‘রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি’।

Advertisements
Flash Fiction, Uncategorized

লগ্নভ্রষ্টা

মৃতফুলের মালা দিয়ে সাজিয়েছিলাম প্রাঙ্গণ, বাসরঘর… আজও সাজিয়ে চলেছি। তবু তুমি আসবে না। চেয়ে থাকবে তোমার অন্যপৃথিবীর জানলা দিয়ে। মৃত রজনীগন্ধার মালা থেকে আজকে ঐ সুগন্ধ আর ভেসে আসে না সেই দিনের পর থেকে, যেদিন ঐ তেলচিটে প্রদীপটার থেকে ভেসে এসেছিল টাটকা তেলের গন্ধ। সলতেতে ধরেছিল আগুন। সেই আগুনের মতোই লাবণ্যপ্রভা হয়েছিলাম আমি, একটা কুড়িয়ে পাওয়া আলগা অহংকার আমায় চেপে ধরেছিল। শঙ্খ-উলুধ্বনিতে রব সৃষ্টি হয়েছিল এই প্রাঙ্গণে। আর ঠিক তারপরেই আমার নামের সাথে আরেকটা তকমা এঁটে গিয়েছিল, ‘লগ্নভ্রষ্টা’। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জা, ঘেন্না, রাগ, আমার অযাচিত অহংকারীনি হওয়ার সুখটা কেড়ে নিলো এক লহমায়.. লাবণ্যপ্রভা মুখখানির রক্তিমতা মিশে গেল বেনারসির লাল বর্ণের সঙ্গে। তখন প্রদীপ থেকে কেবলই ধোঁয়া বের হচ্ছে। আগুন নিভে গিয়েছে। জ্বলেনি আর কখনই।

এখন, সপ্তর্ষিমন্ডলের শেষ দাগটা জুড়তে-জুড়তে তোমায় এইকথা গুলো চিঠিতে লিখছি। তোমায় না পাঠানো চিঠি গুলোতে মরচে ধরার মতো লাল ছোপ পড়েছে। কম দিন তো হলো না, এই পঁয়ত্রিশ বছরের রোজকার এই একই অভ্যাস। তারার সঙ্গে তারাদের জুড়তে-জুড়তে, সপ্তর্ষি মন্ডল খুঁজতে-খুঁজতে, তোমায় পাঠাবো না বলে, একটা করে চিঠি লেখা।

আরণ্যক, তোমার নাতি। আজ সে এই বাড়ির আঙ্গিনায় এসেছে। বর বেশে। আমার বাড়ির এক মেয়েকে তার স্ত্রী করে নিয়ে যাবে বলে। আজ সেই একই ছাদের নীচেই জ্বলন্ত সলতে ডুবানো টাটকা তেলের গন্ধ, ক্ষণে-ক্ষণে মুখোরিত হচ্ছে বাড়ি, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে। সত্তর দশকের এই লগ্নভ্রষ্টার আজ সেখানে যেতে মানা। আগে চাইতাম আরও হাজার-হাজার তুমি আর হাজার-হাজার আমি-র মাঝখানে বেঁচে থাক এই কাঁটাতারের বেড়া, স্বার্থক হোক তোমার ব্রাহ্মণত্বের গরিমা। কিন্তু আজ তা আর চাই না, কারণ, পুরুষেরা কখনও লগ্নভ্রষ্ট হয় না। তারা ধূসরক্ষেত্রে যুদ্ধ করে এলেও সমাজ তাদের অমলিন দেখে। তবু আশা রাখি ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। কেবলই কনকাঞ্জলির আবেগে ধুয়ে যাবে পুরোনো মুহুর্ত গুলো, গড়ে উঠবে নতুন ইতিহাস।