Bengali, Flash Fiction, Ghost

রাতের অতিথি

ভয় আর নির্জনতা আঁকড়ে ধরে,
ঝড় জলের রাতে একলা রাস্তায় যানবাহনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে মেয়েটা।
অবশেষে সামনে একটা বাইক থামলো। কাঁপা কাঁপা ঠান্ডা হাত উঠলো ড্রাইভারের কাঁধে। হাওয়ার গতিতে বাইক চলছে ভুল রাস্তায়, ‘বাইক থামান!’-উত্তর নেই।
বাইক থামলো। অনেক লোকের ভিড় থেকে ভেসে আসছে কয়েকটা শব্দ,’আবার চাঞ্চল্যকর তথ্য, সেই স্পটেই আজ আবারও একটা এক্সিডেন্ট! আপনারা দেখছেন বয়েস তিরিশের একটি মেয়ে…’
সামনে গিয়ে মৃতদেহটা দেখে আঁতকে উঠলো মেয়েটা।
হঠাৎ কানের কাছে ঠান্ডা ফিসফিসানি, ‘কাল রাতে বাইকে করে আমি ফিরছিলাম, কালকের মৃতদেহটা আমার ছিল, আর আজ আপনার! আগে আমার কাজ ছিল অতিথিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, আর এখন আমাদের মতো ‘রাতের অতিথি’-দের তার দেহের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি!’

Ghost, Short Story

ভূত বাংলো

ডায়মন্ড হারবার। তিন বন্ধু বেড়াতে এসেছি। উঠেছি এক বাংলোতে। বাংলোর কেয়ারটেকার মনোহর। দেখলে মনে হয়, কোন মিশমিশে কালো গরিলার অনাহারে বুঝি হাড় জিরজিরে চেহারা হয়েছে। আর হাসলে যেন মনে হয় এক গোছা মুলো যেন দাঁতের জায়গায় বাঁধিয়ে বসেছে!
শীতকাল। এতটা পথ আসার ধকলে, ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে গলাটা বেশ খুসখুস করছিলো। উঠে রান্নাঘরে এলাম। রান্নাঘরটা মোটামুটি অন্ধকার। উনুনের হলদে-লাল আগুনটা কেবল অন্ধকারের গায়ে একধরনের উজ্জ্বল আস্তরণ ফেলেছে।
রান্নাঘরের চৌকাঠের উপর দাঁড়িয়ে মনোহরকে বললাম, ‘মনোহর গলাটা বেশ খুসখুস করছে, এক গেলাস নুন-গরমজল করে দিতে পারো?’
টিনের দরজা খোলার সময় যে ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ হয়, ঠিক সেই রকম আওয়াজে মনোহর হাসতে হাসতে বলল,’জানেন বাবু, আমাদের গাঁয়েতে সবাই বলে, সামুন্দরের পানি শামশানের জ্বলন্ত চিতাতে গরম করে গারগেল করলে সব গলা ব্যথা ছুঁমন্তর।’
আমি হাসতে হাসতে বললাম,’ তুমিতো বেশ মজা করো!

আচ্ছা মনোহর, সবাই বলছিল এই বাংলোটা নাকি ভূত বাংলো?’

মনোহর:’ কাহে সবলোক ইয়ে সব বোলতে হ্যাঁয়! হামি তো কতো সাল সে এখানেই আছি।’
বলা শেষ হওয়া মাত্রই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। মনোহরের ডান হাতটা হঠাৎ দক্ষিণের জানলা দিয়ে ক্রমশ লম্বা হতে-হতে বেড়িয়ে গেল, আবার দু-সেকেন্ডের মধ্যে হাতটা ফিরে এলো, হাতটাতে তখন এক গ্লাস ফুটন্ত গরমজল, আমার দিকে বাড়িয়ে বলল,’বাবু, সামুন্দরের পানি, চিতার আগুনে গরমভি করিয়েছি, গারগেল করিয়েলিন গলা ব্যথা ছুঁমন্তর হয়ে যাবে!’
বলেই আবার সেই ক্যাঁচক্যাঁচ করে হাড়ে হিম ধরানো হাসিটা হেসে উঠলো।
Dystopia

ডিস্টোপিয়া

গভর্নমেন্ট কন্ট্রোল, রিলিজিয়াস কন্ট্রোল, টেকনোলজিকাল কন্ট্রোল, আর লাস্ট, স্ট্রাগল, ধরে নিলাম স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স বা অস্তিত্বের জন্য লড়াই, সবটা যদি আদ্যপ্রান্ত বিচার করি, আমি নিজেকে একটা নিখুঁত ডিস্টোপিয়ান ওয়ার্ল্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পাই!
আমরা যতোই সভ্য হয়ে থাকি না কেন, ডারউইনের মতবাদ সবসময়ের জন্যই কার্যকারী, বিবর্তন সবসময়ই হয়ে চলেছে, যুগে যুগে শুধু তার ধরণ বদলেছে, আমরা সবসময় সে বিষয়ে ভাববার সময় পাই না। সেই ‘অস্তিত্বের জন্য লড়াই’ করতে করতে আমরা এটলাসের মতোই একটা পৃথিবী বয়ে নিয়ে চলেছি,
পৃথিবী?
নাহ!
একটা ভারী ডিস্টোপিয়ান ওয়ার্ল্ড!

Shankha Ghosh

হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া মানুষ

আমরা ক্ষয়ে যাচ্ছি বোধ হয়! তাই না?
মহাকাশ থেকে একটা একটা করে তারা খসে পড়ছে!
আর আমরা কান পেতে শুনতে পাচ্ছি তারা খসার শব্দ!
দেখতে পাচ্ছি ঊর্ধ্ব গগনের এক একটা তারা খসে পড়ে আর জায়গাটা এক রাশ আলো কাটিয়ে অন্ধকার অন্ধকার অন্ধকারে ডুবে যায়!

আমরা শুধু দর্শক হতে পারি!

Life, Nature

‘ভয় পেয়েছো সত্যি কি? দেখছো আমায় আদৌ কি?’

ঐ দূরের কুয়াশা ঘেরা প্রান্তরের শেষ প্রান্তে,নিজের সঙ্গে নিজে বুনো ভাষায় কথা বলতে বলতে একটা সরু,সাদা ফিতের মতো নদী হেঁটে চলেছে দক্ষিণের পথে।
এখনো পর্যন্ত ওকে কেউ নাম জিজ্ঞেস করেনি,তাই ওর নাম জানে না কেউ-ই।
ওর প্রাণে বুঝি ভয় নেই! দিব্যি যে একা একা ছোট্ট মেয়েটার মতো আপনমনে বকতে-বকতে এগিয়ে চলেছে!
আমি তার সেই বুনো ভাষা বুঝি না।
শান্ত কুয়াশার জাজিম জড়িয়ে ধরে রেখেছে সেই থমথমে মুখওয়ালা আকাশ-ছোঁয়া গাছেদের গুড়ির দলকে।
বিশাল পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে আসা অল্প রোদের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যা।
রয়েছি যেনো প্রকৃতির মায়া জগতে।
পায়ের তলায় ঝরাপাতার ভিড়ে পা হারিয়ে যাচ্ছে কখনো-সখনো।
চলতে-চলতে ফিরে আসছি একই পথে আর কোনো-কোনো বুড়ো পাতা কানের পাশ দিয়ে ঝরে যেতে-যেতে শাসিয়ে উঠছে দু-এক কথায়,’আস্তে! এখানে শহুরে প্রাণীদের কথা বলা বারণ, আসতে নেই এখানে তাদের!’
আমি, ‘শহুরে প্রাণী’ সত্যি তো! নিরন্তর আমার হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ট থেকে নিসৃত হয় আতরমাখা শহুরে গন্ধ! কি করবো! কোথায় যাব! এতো বিরাট প্রকৃতি, আমি তার মধ্যে কেবল বেমানানসই শহুরে এক কণা!
সন্ধ্যার ঘন নীল রঙ আমার শরীরে বাধা পাচ্ছে।
অজানা ভয় আমার সারা শরীর জুড়ে চেপে বসেছে।
ইচ্ছা করছে একবার প্রাণপণে চিৎকার করি!
কিসের আতঙ্ক আমার! বৃহদতার আর ক্ষুদ্রতার মাঝে কতোখানি দূরত্ব সেই পরিমাণটা বুঝে ফেলার জন্যে আতঙ্ক?
হঠাৎ নিরক্ষর বুনো হাওয়া বইতে শুরু করেছে দুর্ধর্ষ গতিতে, দূরের নদীটা যেনো এবার বুনো ভাষায় গান জুড়েছে। বিশালাকার বৃক্ষ গুলো সেই বুনো সঙ্গীত গায়ে মেখে, কায়ায় দোলা লাগিয়ে তান্ডব নৃত্যে মেতে উঠেছে, দূর বহু দূর থেকে ভেসে আসছে উচ্ছসিত ডাহুকের ডাক। তার মাঝেই, হঠাৎ জগতে ধ্বনিত হচ্ছে দুটো বাক্য, ‘ভয় পেয়েছো সত্যি কি? দেখছো আমায় আদৌ কি?’

Philosophy

সময়ের বিড়ালছানা

এই নিস্তব্ধতাকে হৃদপদ্মে সযত্নে আঁকড়ে ধরে।
সময়ের বিড়ালছানার খেলা দেখি।
লেজ তুলে বেপরোয়া চিত্তে সে একা একা খেলে বেড়ায়। আমি দাঁড়িয়ে দেখি।
আর আমাকে দোলা দিয়ে যায় ছোটবেলার সেই পুরোনো নরম ঠান্ডা হাওয়া। যতবার দোলা দেয়, আমি ভাবি আমার শরীর বুঝি হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে।
হাওয়ার মধ্যে সেই স্নিগ্ধতা, সেই ছোটবেলার মিঠে গন্ধ। সময়ের বিড়ালছানা খেলে চলে। আর আমি, সেই হাওয়ায় ভেসে ভেসে ছোটবেলায় ফিরতে চাই।

আমি ছোটবেলার গাছেদের সাথে কথা বলি,
গান শোনাই। ওরা আমার কথা শোনে,
গান শোনে আর সময়ের বিড়ালের সাথে তাল মিলিয়ে লম্বা হয়।

আমি ওদের মতো কখনো চাইনি সময়ের বিড়ালের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে।
তবু চলি, চলতে হয় তাই।

একদিন সেই গাছেরাও বুড়ো হবে।
আর আমি ঐ একইরকম ভাবে হাওয়ার মধ্যে
যৌবনের আতরঢালা সুগন্ধ খুঁজতে-খুঁজতে,
খুঁজতে-খুঁজতে সময়ের বিড়ালছানাকে কোলে তুলে,
বেরিয়ে পড়বো নতুন কোনো শৈশবের সন্ধানে।

Philosophy

মনোবৃক্ষ

পায়ের আঙুল গুলো বেঁকে যেতে যেতে, ক্রমশ বাদামি রঙের শিকড়ে পরিণত হচ্ছে। মাটি কামড়ে ধরছে ক্রমশ। ধরিত্রী থেকে শুষে নিচ্ছে রস। খাদ্যগ্রহণের মাধ্যম বদলাচ্ছে আমার।
হাতের আঙুল গুলো বেড়ে যেতে যেতে, বিস্তার করছি শাখা-প্রশাখা। কোনো কোনো অংশ থেকে জন্মেছে পাতা।
মিশমিশে কালো কেশ, গাঢ় থেকে হালকা সবুজে পরিণত হচ্ছে।
সূর্যের আলোর দিকে তাকিয়ে সালোকসংশ্লেষ করতে শিখছি আমি। আর আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছি, নানান চরিত্রের মেঘ। তারা হেসে-ভেসে চলে যাচ্ছে। আমি ছুঁতে পারিনা তাদের। কিছু মেঘ, বৃষ্টি হয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার শরীর, তবু মনকে তারা ছোঁয়ার চেষ্টা করে না।
হয়তো আমি মানুষ থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছি বৃক্ষে।
তাবলে, বৃক্ষের বুঝি মন থাকতে নেই!

Bengali, Bengali Writer, Flash Fiction, Love, Mr.Sunil Gangopadhyay, Philosophy

২৩ শে অক্টোবর সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু দিবস উপলক্ষ্যে

কালো আকাশটার গা ঘেঁষে সূর্যটা উঠতে শুরু করল। তারা গুলো চুপি-চুপি জোনাকির ছদ্মবেশ ধরল আর চুপটি করে লুকিয়ে পড়ল গুহার মধ্যে। লম্বা-লম্বা দেবদারু গাছগুলোর মাথা-ঝাকড়া পাতা গুলোর ফাঁক দিয়ে সূর্যের সেই ‘প্রথম আলো’-টা ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীময়। পাখিদের ডাকের মাঝে শুধু ‘ঝর্ণার জলে’-র আওয়াজের তীব্রতাটাই একটু হারিয়ে গেল। জীবনের তেত্রিশটা বছর কাটিয়েছি এই ভেবে ভেবে যে, ‘কেউ কথা রাখেনি’। নাদের আলি কথা দিয়েছিল আমি বড়ো হলে সে আমাকে ‘তিন প্রহরের বিল’ দেখাবে। নাদের আলি! কোথায় সে! সে তো হাওয়ার সাথে মিলিয়ে গিয়েছে! আজ ‘নীরা’ অবশেষে তুমি এলে আমার সাথে, দুজনে একসাথে ‘তিন প্রহরের বিল’ দেখব বলে। সেই মধ্য রাত থেকে জেগে থাকার ছোট-বড়ো ক্লান্তি গুলো আজ তোমায় ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। কিরকম করে ঘুমোচ্ছ দেখ! ঠিক ছোট্ট শিশুটার মতো। যে দেবদারু গাছে ভর দিয়ে তুমি ঘুমোচ্ছ, তার পাতার ফাঁক দিয়ে একদল সোনালি রোদ তোমার শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তোমার মুখ, ঠোঁট, গাল, এলো চুল সবকিছু ধুয়ে দিচ্ছে সোনালি আলোটা। আর আমি, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু চেয়ে আছি তোমার দিকে। মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছে সোনালি আলো না, ‘সোনালি দুঃখ’ গড়িয়ে পড়ছে তোমার গাল, ঠোঁট আর চিবুক গড়িয়ে। ‘অর্ধেক জীবন’ এই সোনালি দুঃখকেই পরম সুখ মনে করে মখমলের চাদরের মতো জড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম নিজের সর্বাঙ্গে। ছুঁটে ফিরেছি বারবার, দুঃখ নামের নীল বিষটাকে গলায় ধারণ করতে শিখিয়েছিলেন মহেশ্বর। তাইতো নিজের  পৃথিবী খুঁজে ১০৮ টা নীল পদ্ম জড়ো করলে যে নীল রঙ খুঁজে পাওয়া যায় তার তুলনায় আমার কণ্ঠের গরলের নীল রঙ ছিল গাঢ়। তুমি দেখতে পাওনি নীরা.. কেবল চিঠির মধ্যে খুঁজতে চেয়েছ ভুল করে লেখা ভুল গুলো। ‘মহারাজ, আমি তোমার…’ নাহঃ সেই পুরনো বালক ভৃত্যটা আর নই। গত সাতবছর আগেই ইস্তফা দিয়েছি তোমার কাজে। মহারাজ নীরাকে আজ যেতে দাও। ঘুমোতে দাও দেবদারু কোলে মাথা রেখে। আট বছর অপেক্ষায় ছিলাম এই তোমার এলাকায়। আজ নীরা আমার সাথে যাবে। ঘুম ভাঙলে, ঘুমোলে ওকে কেমন লাগে আজ সে সচক্ষে দেখবে।

তারপর…

‘ মহারাজ, কাঁদে না ছিঃ !’

Dreams, Life, Nature, Philosophy

কান পেতে শুনতে চেয়েছি শব্দগুচ্ছ…

চেনা পথের খোঁজ করতে করতে ফেলে এসেছি আমি অনেকটা পথ।
রহস্যময়ী শহরের চোখে চোখ রেখে পড়তে শিখেছি তার অন্তরের ভাষা, খিলখিলিয়ে বয়ে চলা সরু ফিতের মতো নদীর সাথে সুর মিলিয়ে পার করেছি আমি কয়েকটা জন্ম, সহ্য করেছি দুরন্ত বালুরাশিতে বইতে থাকা নিরক্ষর বুনো হাওয়ার দাপট, দেখেছি মেরুজ্যোতির আলো পর্যন্ত।
তারপর পৃথিবীটাকে মুঠোয় ভরে,
ছায়াপথে উবু হয়ে বসে,
কান পেতে আমি শুনতে চেয়েছি পৃথিবীর অন্তরে বাজতে থাকা অনন্ত শব্দগুচ্ছ।

Nature

পাথরকুচি

শহর এক ধূসর কিশলয়। রঞ্জকবিহীন।
তবু এখানে পাথরকুচির মতো মানিয়ে চলে দমবন্ধ সজীবতা।
রাস্তা ছড়িয়ে থাকে শহরের শিরায় শিরায়।

পাথরকুচি ভুলে যায় পুরোনো ধারকের কথা।
তাই ধূসর শহরে ঘুমিয়ে পড়ে কয়েকটা ইতিহাস।
শহর ভুলে গেছে সবুজ রঙের মাহাত্ম্য।
তবু পাথরকুচি পাতার খাঁজে জমে থাকে সুক্ষ্মপ্রাণ, সবুজ বিতরণের অপেক্ষায়।