Analysis, Anti-war, Bengali, Review

টু

"খাঁচার পাখি ছিল  সোনার খাঁচাটিতে
বনের পাখি ছিল বনে।
একদা কী করিয়া মিলন হল দোঁহে,
কী ছিল বিধাতার মনে।"

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই পাখি’ কবিতাটির এই ক’টি লাইনের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের ‘টু’-এর অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। একজন যে ‘সোনার খাঁচা’ তথা ঐশ্বর্য্যে মোড়া অট্টালিকায় থাকে। চতুর্দিকে তার বিবিধ কলের খেলনা ছড়ানো, যখন যেটা ইচ্ছা স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে খেলনা গুলিকে ব্যবহার করতে পারে সে। অপরদিকে, আরেকজন যাকে ‘বনের পাখি’-র সঙ্গে তুলনা করা যায়, সে খোলা আকাশের তলায় বাঁশ-কাঠির তৈরি তীর-ধনুক, বাঁশি, ঘুড়ি তার খেলার সরঞ্জাম। বলা যায় সে প্রকৃতির সন্তান।

প্রকৃতপক্ষে, ১৯৬৪-১৯৭৩ সালের আমেরিকা-ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্মন্ধে ‘টু’ শর্ট ফিল্মটি একটি শান্তির বার্তা দেয়। শর্টফিল্মটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বহু চিহ্নিত নিদর্শন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে,

ধনী শিশুটি অট্টালিকায় বন্দি থেকে এবং দরিদ্র শিশুটি খোলা আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে দ্বন্দ্বতে মত্ত। এক্ষেত্রে, অট্টালিকা তথা সে সুরক্ষা-আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত। অর্থাৎ যুদ্ধে নিযুক্ত সেই ধনী অপেক্ষাকৃত আত্মবিশ্বাসী দেশটিকে নির্দেশ করা হচ্ছে। আবার দরিদ্র বালকের চতুর্দিকে কোনো সুরক্ষা-আচ্ছাদন নেই। সে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে দ্বন্দ্বে নিযুক্ত। অর্থাৎ এখানে যুদ্ধে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশটিকে নির্দেশ করা হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে খেলনা গুলি কি সত্যিই খেলনা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? এক্ষেত্রে খেলনা গুলি সম্পূর্ণরূপে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একে অপরকে খেলনারূপী অস্ত্র প্রদর্শনীতে দুই শিশু আসলে মত্ত। সিনেমার প্রথমে ধনী শিশুটি রীতিমতো একাকীত্বে এবং একঘেয়েমিতে ভোগে ঘর ভর্তি খেলনা থাকা সত্ত্বেও। সে বারংবার আগুন জ্বালিয়ে বেলুন ফাটায়। এর থেকে একটি ধ্বংসাত্মক মানসিকতারও প্রকাশ পাচ্ছে। তাছাড়াও খেলনা রোবটে চুইংগাম লাগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি থেকে বোঝা যায় খেলনা গুলো প্রকৃতপক্ষে তার কাছে মূল্যহীন শুধুমাত্র দরিদ্র শিশুটিকে শায়েস্তা করার অস্ত্রবিশেষ।

অপরদিকে, দরিদ্র শিশুর সকল খেলনাই বাঁশকাঠির তৈরি। দু’জনের দ্বন্দ্বের মাঝে বারবারই কলের খেলনার কাছে বাঁশকাঠির খেলনা হেরে যায়। দরিদ্র শিশুটি ঢোল নিয়ে এসে বাজিয়ে দেখালে, ধনী শিশু একটি খেলনা আনে যাতে ঢোলটি বাজাচ্ছে একটি কলের বাঁদর। অর্থাৎ যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে, ধনী দেশ গুলি সদাসর্বদা তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলি থেকে আমদানীকৃত ‘ক্রীতদাস’ এনে কাজ করায়- এমন তুলনাও হতে পারে।

দ্বন্দ্ব-বিরতিতে ধনী শিশুটিকে একটি আপেল খেতে দেখা যায়। অর্থাৎ যুদ্ধে যারা প্রথম বিশ্বের দেশ তারা সমস্ত সুযোগ সুবিধার ফল ভোগী- এই তুলনাই করা হচ্ছে।

অবশেষে শান্তির বার্তা। সবশেষে বাঁশির বুনো সুরে চাপা পড়ে যায় সমস্ত কলের খেলনার আওয়াজ। এদিকে ধনী শিশুর খেলনার মতো আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে। সে বসে পড়ে অর্থাৎ লড়াই লড়ে যাওয়ার মনোবল সে হারায়।

"বনের পাখি বলে 'আকাশ ঘন নীল,
কোথাও বাধা নাহি তার'
খাঁচার পাখি বলে'খাঁচাটি পরিপাটি
কেমন ঢাকা চারিধার'"

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের’দুই পাখি’র এই লাইন দু’টি দিয়ে যদি ব্যাখ্যা করি, তবে এখানে একটি আত্মশ্লাঘার দ্বন্দ্ব-ও আসে। ধনী ও দরিদ্র শিশু উভয়েই নিজ নিজ ক্ষমতা, স্থান,কাল,পাত্র- ইত্যাদির প্রতি আত্মবিশ্বাসী। তার সঙ্গে এটি প্রকৃতি বনাম যন্ত্রপাতির দ্বন্দ্ব-ও বটে। দরিদ্র শিশুটি যদি প্রকৃতির প্রতিনিধি হয় তবে ধনী শিশুটি অত্যাধুনিক নকল ধী-শক্তি দ্বারা চালিত যন্ত্রপাতির প্রতিনিধি। অর্জিত কৃত্রিম ধী-শক্তির যন্ত্রচালনার দ্বারা প্রকৃতিকে যতো ভাবেই প্রভাবিত করার চেষ্টা করা যাক না কেন, অবশেষে প্রকৃতির জয় অনিবার্য। ঠিক যেমন শর্ট ফিল্মটিতে দেখানো হয়েছে, যখন সমস্ত খেলনায় দম দিয়ে ধনী শিশু নিজের ক্ষনিকের জয় উদযাপন করছে ঠিক সেই সময় দরিদ্র শিশুর বাঁশির সেই বুনো সুর, যন্ত্রপাতির আওয়াজ গুলিকে ছাপিয়ে গিয়েছ।

সবশেষে বলাইবাহুল্য, একটি ছায়াছবিতে পরিচালনায় সত্যজিৎ রায়ের নামটাই যথেষ্ট। তাঁর ভাবনাচিন্তা, পরিবেশন পদ্ধতিতে, তিনি অসামান্য, অনবদ্য। তাঁর সকল সিনেমার মতো ‘টু’-শর্ট ফিল্মটিও বিশ্বব্যাপী সাদরে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। শিল্প সবসময়ই ভাষার মতো মাধ্যম, যে মাধ্যমের দ্বারা বিশ্বের দরবারে বহু বার্তা দেওয়া সম্ভব। ঠিক সেই মতোই ‘টু’- শর্ট ফিল্মটি একটি নিজস্ব বার্তা বহন করে।

সাল-১৯৬৪, পরিচালনা, স্ক্রিন-প্লে, মিউজিক- সত্যজিৎ রায়। প্রযোজনা- এসসো ওয়ার্ল্ড থিয়েটার। সিনেমাটোগ্রাফি- সৌমেন্দু রায়, সম্পাদনা- দুলাল দত্ত। শর্ট ফিল্ম (সময়)- ১২মিনিট

২২ শে শ্রাবণ, Bengali, Review

‘বাইশে শ্রাবণ’

পরিচালনা, গল্প, চিত্রনাট্য- সৃজিত মুখোপাধ্যায়, প্রযোজনা- শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস, অভিনয়- প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, আবির চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ঘোষ প্রমুখ। সুরকার (মিউজিক কম্পোজার)- অনুপম রায়, মুক্তি পায়- ৩০ শে সেপ্টেম্বর’১১।

-‘হুইস্কি চলে?’

-‘না’

-‘বর্নভিটা?’

-‘না। ধন্যবাদ।’

আপাতদৃষ্টিতে দেখলে চরিত্রটি এতোটাই ব্যঙ্গপূর্ণ কথা ছুড়ে দিতে পারেন বাকি চরিত্র গুলোর দিকে। প্রতিটি পদেপদে নিজের কঠোরতা, রূঢ়তা, ঔদ্ধত্য, আত্মঅহংকার উগরে দিতে চান। আসলে এই প্রত্যেকটা নেতিবাচক শব্দই চরিত্রটির একটি বিষয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত- হতাশা। চরিত্রের নাম প্রবীর রায় চৌধুরী। সিনেমাটি দেখলেই বোঝা যায় প্রবীরবাবুর চেহারা, মন এমন কি বাড়িটারও একই অবস্থা- ভগ্ন, জীর্ণ- জর্জরিত, প্রাণহীন, শুধু যেন কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে। প্রবীরবাবু একজন সারাজীবনের মতো সাসপেন্ডেড হওয়া পুলিশ অফিসার। অতিরিক্ত রাগ, আসামীদের নিজস্ব শত্রু বলে মনে করা, কয়েদিদের মারতে মারতে মেরে ফেলা, এই কারণেই তিনি সাসপেন্ডেড। তবু তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধির জন্য সে পুলিশ অফিসার হিসাবে ভারতবর্ষের অন্যতম।

নির্দিষ্ট একটি মোটিভ বজায় রেখে শহরে ঘটে চলেছে একটার পর একটা খুন। সেই খুনের মোটিভ অনুসারে নামকরণ করা হয়েছে ‘বাইশে শ্রাবণ’। সেই দিক থেকে নামকরণটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। নিপুণতা ও দক্ষতার সঙ্গে শব্দ দিয়ে চিত্রনাট্য বুনেছেন সৃজিত মুখার্জী। পরিচালনা ও চিত্রনাট্যের দিক থেকে দেখতে গেলে সৃজিত মুখার্জী নিঃসন্দেহে অসাধারণ। তার সাথে রয়েছে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ঘোষ, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, আবির চট্টোপাধ্যায়-দের মতো সুদক্ষ অভিনেতা, অভিনেত্রীদের অভিনয়। তাঁরা যে যাঁর চরিত্রে অনবদ্য। বিশেষ কিছু সংলাপ পরিবেশনা দর্শকদের ভীষণভাবে মন কেড়েছে। গৌতম ঘোষ অভিনীত পাগলা কবির চরিত্রের মাধ্যমে বিশেষ ভাবে কিছু কবিদের হাঁড়ির হাল তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমায় ব্যবহৃত অনুপম রায়ের কম্পোজিশন, ‘একবার বল’, ‘যে ভাবে জলদি হাত’- ইত্যাদি ব্যবহৃত প্রতিটি গান-ই দর্শকের মন ছুঁয়ে গিয়েছে।

মাঝখানে রয়েছে অভিজিৎ পাকরাশী (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) ও অমৃতা (রাইমা সেন)-এর ছোট্ট একটি প্রেমের গল্প। প্রেমের গল্পটি সিনেমার মূল গল্পের সাথে সমান্তরালে বহমান। সেটি দর্শকদের মন কেড়েছে।

সব মিলিয়ে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারটি তৎকালীন বাংলা চলচ্চিত্রের গতনুগতিকতা ভেঙে দর্শকের মনে এনে দেয় এক অন্যরকমের বৈচিত্রতা। ছায়াছবির মূল গল্পটি মূলত ‘সেভেন’ (১৯৯৫) এবং ‘রাইটেয়াস কিল’ (২০০৮) থেকে নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে সিনেমাটি অবশ্যই মনোগ্রাহী। সব মিলিয়ে সিনেমাটি পরিপূর্ণতা পেয়েছে। সিনেমার শেষে রয়েছে সব চেয়ে বড়ো ট্যুইস্ট।’বাইশে শ্রাবণ’ মুক্তি পাওয়ার প্রায় নয় বছর পর ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর দ্বিতীয় পর্ব হিসেবে মুক্তি পায় ‘দ্বিতীয় পুরুষ’।

আমার শহর, উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়ি, কলকাতা, Bengali, Kolkata, My City, Social Issues

শহর হারিয়ে যায় শহরের গর্ভেই

‘ইঁটের টোপর মাথায় পরা শহর কলকাতা।’ কলকাতা বরাবরই ইঁটের টোপর পরিহিত, সিমেন্টের ধূসর জঙ্গল। তবু উত্তর কলকাতার ইঁট-পাথরের বড়ো-বড়ো পুরোনো বাড়ি আর কুহেলী-কমলা হ্যালোজেনের আলোর মাঝে, আমরা হারিয়ে যেতে ভালোবাসি অলিগলি থেকে রাজপথে।

দেড়শো বছর আগে এই রাস্তাগুলিতেই দৌড়ে যেতো শত ঘোড়ার গাড়ি, জমিদার বাড়ির অন্দর থেকে ভেসে আসতো কোলাহল, সিংহদুয়ারে জ্বলতো ঝকঝকে দাপুটে মশাল। আজ সেই মশালের আলো, বন্দি হয়ে যাচ্ছে ফ্ল্যাটবাড়ির ছোট খোপ-ঘরে। স্থবির, বৃদ্ধ, বড়ো বাড়ি গুলি হয়ে যাচ্ছে একা। কখনও বা কোনো কোনো বাড়ির একটি ঘরে ফেড হওয়া পর্দার ফাঁক দিয়ে দুলতে থাকে আবছা আলো। তবু বেশিরভাগই আজ ভগ্নপ্রায়। বড়ো-বড়ো বাড়ির মালিকরা ছেড়ে চলে যাচ্ছে বাড়ি গুলিকে। আবার সেই পরিত্যক্ত বাড়িগুলি চলে যাচ্ছে প্রমোটারের হাতে। বাড়িগুলির সাথে সাথে ভাঙছে অনেক স্মৃতি, অনেক গল্প, আর গুচ্ছ-গুচ্ছ ইতিহাস। আর কলকাতা পাল্টে যাচ্ছে কলকাতার যাদুতেই।

সম্প্রতি, পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেন। তাঁর কথায়, ” ওপেন- টি- বায়োস্কোপে’- এর বৈশাখী ফোয়ারার বাড়িটি শ্যুটিং-এর পরপরই ভেঙে দেওয়া হয়েছিলো। এখন সেখানে চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। এবার ভাঙা পড়লো কন্দর্পনারায়ণের রাজবাড়ি। ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ির’ শ্যুটিং হয়েছিলো এই মহিষাদলের পুরোনো রাজবাড়িটিতে। বাড়ির নীচের এক প্রকোষ্ঠে একদা বাঘ থাকতো এ বাড়িতে। একরাত শ্যুটিং করেছিলাম এখানে। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে ছিলো এর সঙ্গে। তারও কিছু মনে পড়লো বই কি! একটার পর একটা বাড়ি ভাঙে, আর অনেক গুলো মন।’ ”মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’র শ্যুটিং হওয়া রাজবাড়িটির সাথে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসটিতে দেওয়া রাজবাড়িটির বর্ণনার সাথে অদ্ভুত ভাবে মিলে যায়। তবু ভেঙে পড়ে সমস্ত স্মৃতি।’

তবে, প্রশ্ন শুধুই কি আমাদের নস্টালজিয়ায় আটকে থাকে, কলকাতার এই পুরোনো ইন্দো-ইউরোপিয়ান স্টাইলের বাড়িগুলিকে ঘিরে থাকে বড়ো-বড়ো প্রশ্ন। বাড়ি গুলির মধ্যে বন্দি কলকাতার ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। এই পেল্লাই বাড়িতেই সেই পুরোনো দিন গুলি থেকে বেড়েছে ভাগীদারের সংখ্যা। বাড়িগুলিকে নিজেদের মতো করেই ছোট-ছোট ভাগে বিভক্ত করেছেন তারা। কেউ কেউ বা বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। যারা থাকেন তাদের আবার মাঝে মাঝেই ভূসম্পত্তিগত বিবিধ সমস্যার সম্মুখিন হতে হয় পৌরসভার কাছে। এতো সমস্যার সম্মুখিন হতে না চেয়ে বেশিরভাগ বাড়ির মালিকেরাই তাদের বড়ো বাড়িটি, শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষীটিকে তুলে দেন প্রমোটারের হাতে। এই ভাবেই ধূসর শহরে হারিয়ে যায় কয়েকটা ইতিহাস।

হলুদ ট্যাক্সির জানলা দিয়ে দেখা যায় চলন্ত ঐ সবুজ বাড়িটা আর তার পাশের লাল কৃষ্ণচূড়া গাছটা। চলন্ত ট্যাক্সি থেকে দু’টি-কে একসাথে দেখে যেন মনে হয় একটা ছটফটে টিয়াপাখি যেন উড়ে যাচ্ছে।

দশ বছর পর এখন টিয়ারঙা বাড়িটা আর নেই, কৃষ্ণচূড়ার গাছের বদলে সেখানে কেবল পাতা কতোগুলো চেয়ার-টেবিল। সবুজ বাড়ির বদলে দাঁড়িয়ে আছে একটা আলো ঝলমলে ক্যাফেটেরিয়া। ক্যাফেটেরিয়ার কাচের ভিতরে কতোজন আবেগে ভাসমান মানুষ, যারা কোনোদিনও জানতেই পারেনি ঐ টিয়াপাখিরঙা বাড়ি আর কৃষ্ণচূড়া গাছটার কথা। এইভাবেই শহর পুরোনো পোশাক বদলে ফেলে। এইভাবেই শহর জীবন্ত থাকে।

Life, Nature

‘ভয় পেয়েছো সত্যি কি? দেখছো আমায় আদৌ কি?’

ঐ দূরের কুয়াশা ঘেরা প্রান্তরের শেষ প্রান্তে,নিজের সঙ্গে নিজে বুনো ভাষায় কথা বলতে বলতে একটা সরু,সাদা ফিতের মতো নদী হেঁটে চলেছে দক্ষিণের পথে।
এখনো পর্যন্ত ওকে কেউ নাম জিজ্ঞেস করেনি,তাই ওর নাম জানে না কেউ-ই।
ওর প্রাণে বুঝি ভয় নেই! দিব্যি যে একা একা ছোট্ট মেয়েটার মতো আপনমনে বকতে-বকতে এগিয়ে চলেছে!
আমি তার সেই বুনো ভাষা বুঝি না।
শান্ত কুয়াশার জাজিম জড়িয়ে ধরে রেখেছে সেই থমথমে মুখওয়ালা আকাশ-ছোঁয়া গাছেদের গুড়ির দলকে।
বিশাল পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে আসা অল্প রোদের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যা।
রয়েছি যেনো প্রকৃতির মায়া জগতে।
পায়ের তলায় ঝরাপাতার ভিড়ে পা হারিয়ে যাচ্ছে কখনো-সখনো।
চলতে-চলতে ফিরে আসছি একই পথে আর কোনো-কোনো বুড়ো পাতা কানের পাশ দিয়ে ঝরে যেতে-যেতে শাসিয়ে উঠছে দু-এক কথায়,’আস্তে! এখানে শহুরে প্রাণীদের কথা বলা বারণ, আসতে নেই এখানে তাদের!’
আমি, ‘শহুরে প্রাণী’ সত্যি তো! নিরন্তর আমার হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ট থেকে নিসৃত হয় আতরমাখা শহুরে গন্ধ! কি করবো! কোথায় যাব! এতো বিরাট প্রকৃতি, আমি তার মধ্যে কেবল বেমানানসই শহুরে এক কণা!
সন্ধ্যার ঘন নীল রঙ আমার শরীরে বাধা পাচ্ছে।
অজানা ভয় আমার সারা শরীর জুড়ে চেপে বসেছে।
ইচ্ছা করছে একবার প্রাণপণে চিৎকার করি!
কিসের আতঙ্ক আমার! বৃহদতার আর ক্ষুদ্রতার মাঝে কতোখানি দূরত্ব সেই পরিমাণটা বুঝে ফেলার জন্যে আতঙ্ক?
হঠাৎ নিরক্ষর বুনো হাওয়া বইতে শুরু করেছে দুর্ধর্ষ গতিতে, দূরের নদীটা যেনো এবার বুনো ভাষায় গান জুড়েছে। বিশালাকার বৃক্ষ গুলো সেই বুনো সঙ্গীত গায়ে মেখে, কায়ায় দোলা লাগিয়ে তান্ডব নৃত্যে মেতে উঠেছে, দূর বহু দূর থেকে ভেসে আসছে উচ্ছসিত ডাহুকের ডাক। তার মাঝেই, হঠাৎ জগতে ধ্বনিত হচ্ছে দুটো বাক্য, ‘ভয় পেয়েছো সত্যি কি? দেখছো আমায় আদৌ কি?’

Philosophy

সময়ের বিড়ালছানা

এই নিস্তব্ধতাকে হৃদপদ্মে সযত্নে আঁকড়ে ধরে।
সময়ের বিড়ালছানার খেলা দেখি।
লেজ তুলে বেপরোয়া চিত্তে সে একা একা খেলে বেড়ায়। আমি দাঁড়িয়ে দেখি।
আর আমাকে দোলা দিয়ে যায় ছোটবেলার সেই পুরোনো নরম ঠান্ডা হাওয়া। যতবার দোলা দেয়, আমি ভাবি আমার শরীর বুঝি হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে।
হাওয়ার মধ্যে সেই স্নিগ্ধতা, সেই ছোটবেলার মিঠে গন্ধ। সময়ের বিড়ালছানা খেলে চলে। আর আমি, সেই হাওয়ায় ভেসে ভেসে ছোটবেলায় ফিরতে চাই।

আমি ছোটবেলার গাছেদের সাথে কথা বলি,
গান শোনাই। ওরা আমার কথা শোনে,
গান শোনে আর সময়ের বিড়ালের সাথে তাল মিলিয়ে লম্বা হয়।

আমি ওদের মতো কখনো চাইনি সময়ের বিড়ালের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে।
তবু চলি, চলতে হয় তাই।

একদিন সেই গাছেরাও বুড়ো হবে।
আর আমি ঐ একইরকম ভাবে হাওয়ার মধ্যে
যৌবনের আতরঢালা সুগন্ধ খুঁজতে-খুঁজতে,
খুঁজতে-খুঁজতে সময়ের বিড়ালছানাকে কোলে তুলে,
বেরিয়ে পড়বো নতুন কোনো শৈশবের সন্ধানে।

Philosophy

মনোবৃক্ষ

পায়ের আঙুল গুলো বেঁকে যেতে যেতে, ক্রমশ বাদামি রঙের শিকড়ে পরিণত হচ্ছে। মাটি কামড়ে ধরছে ক্রমশ। ধরিত্রী থেকে শুষে নিচ্ছে রস। খাদ্যগ্রহণের মাধ্যম বদলাচ্ছে আমার।
হাতের আঙুল গুলো বেড়ে যেতে যেতে, বিস্তার করছি শাখা-প্রশাখা। কোনো কোনো অংশ থেকে জন্মেছে পাতা।
মিশমিশে কালো কেশ, গাঢ় থেকে হালকা সবুজে পরিণত হচ্ছে।
সূর্যের আলোর দিকে তাকিয়ে সালোকসংশ্লেষ করতে শিখছি আমি। আর আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছি, নানান চরিত্রের মেঘ। তারা হেসে-ভেসে চলে যাচ্ছে। আমি ছুঁতে পারিনা তাদের। কিছু মেঘ, বৃষ্টি হয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার শরীর, তবু মনকে তারা ছোঁয়ার চেষ্টা করে না।
হয়তো আমি মানুষ থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছি বৃক্ষে।
তাবলে, বৃক্ষের বুঝি মন থাকতে নেই!

Review

‘তারাভরা আকাশের নীচে’

‘তারা ভরা আকাশের নীচে’- শ্রীজাত

‘তারা ভরা আকাশের নীচে’- লেখক- শ্রীজাত

“দ্য স্টারি নাইট। আমার চারপাশটাই  ‘দ্য স্টারি নাইট’-এর ছবিটার মতো হয়ে যায়। আমি হুবহু ওই চারপাশ, ওই গাছ, বাড়ি, রাতের আকাশটা দেখতে পাই। ইন ফ্যাক্ট, ছবিটার মধ্যে হেঁটে বেড়াই।” -লাইন ক’টা পড়তেই শরীরের মধ্যে দিয়ে শিহরণ-স্রোত বয়ে যায়। এমন করে কেউ ভাবতে পারে এবং ভাববার রসদ জোগাতে পারে- সেটাই এই বইটির প্রতি একটা অন্য রকম মুগ্ধতা নিয়ে আসে।
‘বাস্তব হল কল্পনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ এক ষড়যন্ত্র।’- সত্যি কথা বলতে, আমরা কেউ কেউ সেই ষড়যন্ত্রের শিকার কিংবা আমরা বেশিরভাগই সেই ষড়যন্ত্র গড়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কল্পনাশক্তি যে বাতাসের থেকেও দ্রুতগামী- আসলে সেটা আমরা ভাবতে চাই না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বলেও মনে করি।
দু’টো কাল, দু’টো জীবন- একটি জীবনের মালিক ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এবং অন্যজন সাধারণ আমাদের এই ‘ঘরোয়া শহর’ কলকাতায় বেড়ে ওঠা ঋত্বিক। আর ‘তারাভরা আকাশের নীচে’ কিংবা সামনে দাঁড়িয়ে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এবং কলম-বন্দি ঋত্বিকের মধ্যে অদ্ভুত অন্তমিল পান শ্রীজাত। তাই এই অনন্ত মিল থাকা দু’জনের জীবনই হয়তো মিলে যায় ‘দ্য স্টারি নাইট’- এর সেই গভীর, ঘন নীল, ঘূর্ণিত আকাশটার মধ্যে অথবা কল্পনার কোনো এক সমান্তরাল জগতে।

Bengali, Flash Fiction, Ghost

রাতের অতিথি

ভয় আর নির্জনতা আঁকড়ে ধরে,
ঝড় জলের রাতে একলা রাস্তায় যানবাহনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে মেয়েটা।
অবশেষে সামনে একটা বাইক থামলো। কাঁপা কাঁপা ঠান্ডা হাত উঠলো ড্রাইভারের কাঁধে। হাওয়ার গতিতে বাইক চলছে ভুল রাস্তায়, ‘বাইক থামান!’-উত্তর নেই।
বাইক থামলো। অনেক লোকের ভিড় থেকে ভেসে আসছে কয়েকটা শব্দ,’আবার চাঞ্চল্যকর তথ্য, সেই স্পটেই আজ আবারও একটা এক্সিডেন্ট! আপনারা দেখছেন বয়েস তিরিশের একটি মেয়ে…’
সামনে গিয়ে মৃতদেহটা দেখে আঁতকে উঠলো মেয়েটা।
হঠাৎ কানের কাছে ঠান্ডা ফিসফিসানি, ‘কাল রাতে বাইকে করে আমি ফিরছিলাম, কালকের মৃতদেহটা আমার ছিল, আর আজ আপনার! আগে আমার কাজ ছিল অতিথিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, আর এখন আমাদের মতো ‘রাতের অতিথি’-দের তার দেহের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি!’

Ghost, Short Story

ভূত বাংলো

ডায়মন্ড হারবার। তিন বন্ধু বেড়াতে এসেছি। উঠেছি এক বাংলোতে। বাংলোর কেয়ারটেকার মনোহর। দেখলে মনে হয়, কোন মিশমিশে কালো গরিলার অনাহারে বুঝি হাড় জিরজিরে চেহারা হয়েছে। আর হাসলে যেন মনে হয় এক গোছা মুলো যেন দাঁতের জায়গায় বাঁধিয়ে বসেছে!
শীতকাল। এতটা পথ আসার ধকলে, ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে গলাটা বেশ খুসখুস করছিলো। উঠে রান্নাঘরে এলাম। রান্নাঘরটা মোটামুটি অন্ধকার। উনুনের হলদে-লাল আগুনটা কেবল অন্ধকারের গায়ে একধরনের উজ্জ্বল আস্তরণ ফেলেছে।
রান্নাঘরের চৌকাঠের উপর দাঁড়িয়ে মনোহরকে বললাম, ‘মনোহর গলাটা বেশ খুসখুস করছে, এক গেলাস নুন-গরমজল করে দিতে পারো?’
টিনের দরজা খোলার সময় যে ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ হয়, ঠিক সেই রকম আওয়াজে মনোহর হাসতে হাসতে বলল,’জানেন বাবু, আমাদের গাঁয়েতে সবাই বলে, সামুন্দরের পানি শামশানের জ্বলন্ত চিতাতে গরম করে গারগেল করলে সব গলা ব্যথা ছুঁমন্তর।’
আমি হাসতে হাসতে বললাম,’ তুমিতো বেশ মজা করো!

আচ্ছা মনোহর, সবাই বলছিল এই বাংলোটা নাকি ভূত বাংলো?’

মনোহর:’ কাহে সবলোক ইয়ে সব বোলতে হ্যাঁয়! হামি তো কতো সাল সে এখানেই আছি।’
বলা শেষ হওয়া মাত্রই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। মনোহরের ডান হাতটা হঠাৎ দক্ষিণের জানলা দিয়ে ক্রমশ লম্বা হতে-হতে বেড়িয়ে গেল, আবার দু-সেকেন্ডের মধ্যে হাতটা ফিরে এলো, হাতটাতে তখন এক গ্লাস ফুটন্ত গরমজল, আমার দিকে বাড়িয়ে বলল,’বাবু, সামুন্দরের পানি, চিতার আগুনে গরমভি করিয়েছি, গারগেল করিয়েলিন গলা ব্যথা ছুঁমন্তর হয়ে যাবে!’
বলেই আবার সেই ক্যাঁচক্যাঁচ করে হাড়ে হিম ধরানো হাসিটা হেসে উঠলো।
Dystopia

ডিস্টোপিয়া

গভর্নমেন্ট কন্ট্রোল, রিলিজিয়াস কন্ট্রোল, টেকনোলজিকাল কন্ট্রোল, আর লাস্ট, স্ট্রাগল, ধরে নিলাম স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স বা অস্তিত্বের জন্য লড়াই, সবটা যদি আদ্যপ্রান্ত বিচার করি, আমি নিজেকে একটা নিখুঁত ডিস্টোপিয়ান ওয়ার্ল্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পাই!
আমরা যতোই সভ্য হয়ে থাকি না কেন, ডারউইনের মতবাদ সবসময়ের জন্যই কার্যকারী, বিবর্তন সবসময়ই হয়ে চলেছে, যুগে যুগে শুধু তার ধরণ বদলেছে, আমরা সবসময় সে বিষয়ে ভাববার সময় পাই না। সেই ‘অস্তিত্বের জন্য লড়াই’ করতে করতে আমরা এটলাসের মতোই একটা পৃথিবী বয়ে নিয়ে চলেছি,
পৃথিবী?
নাহ!
একটা ভারী ডিস্টোপিয়ান ওয়ার্ল্ড!