Uncategorized

বেদনাস্নাত

দূরে থাক আলোর ঝকমকানি
মাঝে মাঝে ফিরে ফিরে আসুক ছায়াদের গল্প।
দুঃখ জমুক হৃদপিন্ডে।
হৃদয়ে মোচড় দিক দু-তিন বার।
তারপর গলে যাক দুঃখের হিমশৈল গুলো।
আমি কাঁদি, কাঁদতে থাকি, কান্না থামলে,
বোধ শক্তি বাড়ে, সমব্যথী হতে শিখি।

তারপর দুহাতে ধরিত্রীর গাল বেয়ে পড়া অশ্রু মুছিয়ে দি।

Philosophy

মনোবৃক্ষ

পায়ের আঙুল গুলো বেঁকে যেতে যেতে, ক্রমশ বাদামি রঙের শিকড়ে পরিণত হচ্ছে। মাটি কামড়ে ধরছে ক্রমশ। ধরিত্রী থেকে শুষে নিচ্ছে রস। খাদ্যগ্রহণের মাধ্যম বদলাচ্ছে আমার।
হাতের আঙুল গুলো বেড়ে যেতে যেতে, বিস্তার করছি শাখা-প্রশাখা। কোনো কোনো অংশ থেকে জন্মেছে পাতা।
মিশমিশে কালো কেশ, গাঢ় থেকে হালকা সবুজে পরিণত হচ্ছে।
সূর্যের আলোর দিকে তাকিয়ে সালোকসংশ্লেষ করতে শিখছি আমি। আর আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছি, নানান চরিত্রের মেঘ। তারা হেসে-ভেসে চলে যাচ্ছে। আমি ছুঁতে পারিনা তাদের। কিছু মেঘ, বৃষ্টি হয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার শরীর, তবু মনকে তারা ছুঁতে পারে না।
হয়তো আমি মানুষ থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছি বৃক্ষে।
তাবলে, বৃক্ষের বুঝি মন থাকতে নেই!

Monsoon, Nature

মেঘ, বৃষ্টি, রেনকোট আর কৌশিধ্বনি

একা একা ঝুলে আছে বারান্দার দেওয়ালের হুকে।
আজ বাতাসে জলীয় বাষ্প ভেসে বেড়াচ্ছে বেশি
তাই বোধ হয় ধূপের ধোঁয়া মিশছে না বাতাসে।
সাদা সাদা ধোঁয়া নিজের মতো বাতাসে আঁকিবুকি কেটে চলেছে।
কখনও বা তৈরি করতে চাইছে কোনো রঙ্গিনীর অবয়ব।
এর মধ্যেই দু-তিন বার মেঘেদের গর্জন, চমকে দেয়নি আমায়।
কেন জানি না আমি গুনগুন করে চলেছি কৌশিধ্বনির বন্দিশ, ‘আয়ো রি বসন্ত…’।
হঠাৎ মনে হলো এ আমি কি গাইছি এরকম ঘন-ঘোর মেঘ বর্ষার দিনে বসন্ত কালের বন্দিশ!
নিজের মনেই হেসে উঠলাম। জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
অনবরত বৃষ্টির দাপট আমায় ভিজিয়ে দেওয়ার সাহস রাখে।
শরীরে বৃষ্টি এসে পড়লেও, মনে তো বসন্ত খেলা করতেই পারে।
রেনকোটটা এখনও নিজের মতো ঝুলে আছে, আর বারবার যেন আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছে ‘এখন বর্ষাকাল’।
তার দিকে তাকিয়ে একবার বিদ্রুপ করে বলে উঠলাম,
‘তাতে কি হলো, বর্ষাতেও কি মন, বসন্তের হওয়ায় ভাসতে পারে না!’
আবার আমি গেয়ে উঠলাম, ‘আয়ো রি বসন্ত…’,
বাইরে চলল মেঘ-বৃষ্টির খেলা,
আর মনে চলল
আগন্তুক বসন্তের আনাগোনা।

Life, Philosophy, Way, Way of Life

পথ-পথিক

পথে পথে মিশে গেছে, অজানা পথিকের পায়ের ধুলো।
হেঁটে গেছে সে ফেরেনি কখনও।
শুধু দিগন্ত রেখা ধরে ফেলে গেছে পায়ের ছাপ।
ক্রমে বদলে গেছে ছাপের আকার।

পথ-ও হেঁটে গেছে পথের মতো।
সে পথিকের পরোয়া করে না।

শুধু নতুন পথিক, পথ খুঁজে বেড়ায় পুরোনো পথিকদের পায়ের চিহ্ন ধরে।

আমার শহর, কলকাতা, Kolkata, My City

তিলোত্তমা কলকাতা

বিন্দু বিন্দু হলদে-কমলা আলো জমে আছে ময়দানের ওপারে।
ইটের মুকুট মাথায় পরে, আকাশের সোনালি আলো গায়ে মেখে তিলোত্তমা দাঁড়িয়ে আছে বয়েস আঠেরোর কিশোরীর মতো।
গাছ-মেঘেদের মধ্যে চলছে অনর্গল কথোপকথন।
তাদের ভাষার নাম বৃষ্টি।
এখন কথা বলতে বাধা নেই।
তাদের কথা চাপা দেওয়ার জন্য ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়ানো কোনো দুই বা চারপায়া অসভ্যের মতো আর চিৎকার করে না।
ঝিমিয়ে আছে মানুষ গুলো।
অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে নিজেকে সাজাচ্ছে তিলোত্তমা।
কারণ, কিশোরী থেকে যুবতী হওয়ার সময় এসেছে তার।

Life, Philosophy

নামতে নামতে….

সিঁড়ি গুলো নেমে চলেছে অকাল-গহ্বরে।
ধিকিধিকি আলো জ্বলছে মশাল গুলোর মাথায়।
কেউ নেই, তাই শব্দ নেই, বাতাস যেন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
তবু তুমি পা বাড়ালে নিচের দিকে!
সঙ্গে সঙ্গে মশালের তেজ কমলো।
আলো কমতেই নির্বুদ্ধিতায় চেপে ধরলো তোমায়।
নামলে আরও দুটো ধাপ। কেউ নেই তোমায় নিষেধ করবার মতো।
তোমার ভারি মজা লাগলো। ঠোঁটের কোণায় লাগিয়ে নিলে চিটচিটে একটা পৈশাচিক হাসি, অঙ্গ থেকে খুলে ফেললে স্বচ্ছতা আর ভালোত্বের পোশাকটা, মুখ থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিলে মুখোশটা।
কি বীভৎস দাঁত বের করা রূপ তোমার! এই রূপ কেউ চেনে না।
নিভে গেল সব মশাল। কেবল সিঁড়ির শেষে জ্বলে উঠলো একটা নীলচে আলো। নীলচে আলো যেন তোমায় হাতছানি দিচ্ছে।
কে বোঝাবে তোমায়, মরীচিকার পিছনে যে ছুটতে নেই!
তোমার ঐ বিষাক্ত দাঁত বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালারস, চোখে লোলুপ দৃষ্টি। উদভ্রান্তের মতো নেমে যাচ্ছ তুমি নীল আলোর দিকে।
কোনো কণ্ঠস্বর নেই। সিঁড়ি শেষ। নীল আলোটার শেষ কণাটাও মিলিয়ে গেছে। এবার সিঁড়িটার অস্তিত্ব-ও মুছে যাচ্ছে!
শুধু তুমি, অধমের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছো! অন্ধকার গহ্বরে! একা!

Life, Nature

ঐ দূরের কুয়াশা ঘেরা প্রান্তরের শেষ প্রান্তে,নিজের সঙ্গে নিজে বুনো ভাষায় কথা বলতে বলতে একটা সরু,সাদা ফিতের মতো নদী হেঁটে চলেছে দক্ষিণের পথে।
এখনো পর্যন্ত ওকে কেউ নাম জিজ্ঞেস করেনি,তাই ওর নাম জানে না কেউ-ই।
ও বুঝি তাকে ভয় পায় না! দিব্যি যে ছোট্ট মেয়েটার মতো আপনমনে বকতে-বকতে এগিয়ে চলেছে!
আমি তার সেই বুনো ভাষা বুঝি না।
থমথমে মুখওয়ালা শান্ত কুয়াশার জাজিম জড়িয়ে ধরে রেখেছে সেই আকাশ-ছোঁয়া গাছেদের গুড়ির দলকে।
বিশাল পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে আসা অল্প রোদের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যা।
রয়েছি যেনো প্রকৃতির মায়া জগতে।
পায়ের তলায় ঝরাপাতার ভিড়ে পা হারিয়ে যাচ্ছে কখনো-সখনো।
চলতে-চলতে ফিরে আসছি একই পথে আর কোনো-কোনো বুড়ো পাতা কানের পাশ দিয়ে ঝরে যেতে-যেতে শাসিয়ে উঠছে দু-এক কথায়,’আস্তে! এখানে না-বন্য প্রাণীদের কথা বলা বারণ, আসতে নেই এখানে তাদের!’
আমি, ‘না-বন্য প্রাণী’ সত্যি তো! নিরন্তর আমার হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ট থেকে নিসৃত হয় আতরমাখা শহুরে গন্ধ! কি করবো! কোথায় যাব! এতো বিরাট প্রকৃতি, আমি তার মধ্যে কেবল বেমানানসই শহুরে এক কণা!
সন্ধ্যার ঘন নীল রঙ আমার শরীরে বাধা পাচ্ছে।
অজানা ভয় আমার সারা শরীর জুড়ে চেপে বসেছে।
ইচ্ছা করছে একবার প্রাণপণে চিৎকার করি!
কিসের আতঙ্ক আমার! বৃহদতার আর ক্ষুদ্রতার মাঝে কতোখানি দূরত্ব সেই পরিমাণটা বুঝে ফেলার জন্যে আতঙ্ক?
হঠাৎ নিরক্ষর বুনো হাওয়া বইতে শুরু করেছে দুর্ধর্ষ গতিতে, দূরের নদীটা যেনো এবার বুনো ভাষায় গান জুড়েছে। বিশালাকার বৃক্ষ গুলো সেই বুনো সঙ্গীত গায়ে মেখে, কায়ায় দোলা লাগিয়ে তান্ডব নৃত্যে মেতে উঠেছে, দূর বহু দূর থেকে ভেসে আসছে উচ্ছসিত ডাহুকের ডাক। তার মাঝেই, হঠাৎ জগতে ধ্বনিত হচ্ছে দুটো বাক্য, ‘ভয় পেয়েছো সত্যি কি? দেখছো আমায় আদৌ কি?’

মা, Flash Fiction, Love, Mother, Philosophy

আরও একবার ২৯৪ দিন

চেনা ঘরের বাইরে বেরোনোটা তার মোটেই পছন্দ নয়।
ঘরের বাইরের ভাষায়, ভাষা মেলানোটা নেহাত কলপুতুলের কাজ।
তাইতো সে হাত-পা ছুড়ে আবদার রাখে মায়ের কাছে,
সে হাঁটতে চায় পিছনের দিকে।
হেঁটে-হেঁটে আবার ভ্রুণ হয়ে ফিরে যেতে চায় মাতৃগর্ভে।
সেইইই-যে চেনা ঘরে। চেনা ফুল, চেনা বাগিচায়।
যেখানে প্রশ্বাসটুকু না নিলেও,
পারিজাতের তরল সুবাস ঘিরে থাকে শরীরটাকে।
২৯৪ দিনে আশ মেটেনি।
এ দেহ তার মোটেই পছন্দ নয়।
তাই নিথর দেহ ফেলে রেখে মাকে ফিসফিসিয়ে বলে গেল,
‘আবার ফিরছি তোমার গর্ভে।
আরও একবার ২৯৪ দিন, রাখবে তো?’

Social Issues

এক টুকরো আলো

এক টুকরো আলো, কুড়িয়ে পেলাম, ল্যাম্প পোস্টের তলা থেকে।
তোমরা নাকি আলোকে কাচ বন্দী করো?
শাসিয়ে রাখো উত্তপ্ত ফিলামেন্টের আগায়?
অন্ধকারে তলিয়ে গিয়ে, ঝিঁঝির শব্দ যে দিকে গেছে সেই দিকে যাও জোনাকি ধরতে?
তবেই শোনো,
এই তো সেদিন, হাঁটছি এক অতীতের রাস্তা দিয়ে।
অন্ধকারে ভাসতে ভাসতে চলেছি আমি।
চোখ সয়েছে কিছুটা। হঠাৎ একটা মানুষ, মাথাটা বীভৎস ভাবে ফেটে গিয়েছে, পরনের মলিনচাদর, পুরোনো রক্তে খয়েরী হয়ে গিয়েছে। মাথা থেকে রক্ত কিন্তু ঝরছে!
আমি ব্যস্ত হয়ে জিগ্যেস করলাম,’কে আপনি, কি হয়েছে আপনার?’
উত্তর এলো,’অবহেলায়, আলো, ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে, সামলাও তাকে! সাবধান হও! তোমরা তো যুব সমাজ, নিজের দায়িত্ব পালন করো! অশিক্ষা পৃথিবীকে গ্রাস করলে, আলো বাঁচাবে কি করে!’
আমি অবাক হয়ে বললাম,’আপনার মাথায়…’
-‘এই রক্তক্ষরণ সেই দিন বন্ধ হবে, যে দিন যুব সমাজ অশিক্ষার সঙ্গে লড়াই করে জিতবে, আবার আলোয় সেজে উঠবে পৃথিবী, যাও এগিয়ে যাও, হাতে যে সময় নেই বেশি, বাঁচাও আলোকে’ বলতে বলতে হেঁটে চলে গেলেন ব্যক্তি।
আমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, তারপর আবার হাঁটা। হঠাৎ একটা আবছা আলো। একটা ল্যাম্পপোস্ট! দৌড়ে গেলাম, কুড়িয়ে পেলাম এক টুকরো আলো।
আবার, ফিরে এলাম বর্তমানে, আলো, তখন রূপ পাল্টে একটা গোলাপি বইয়ের রূপ নিয়েছে, উপরে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম, ‘বর্ণপরিচয়’।